
জনকন্ঠ॥
চট্টগ্রামে আটক জঙ্গী ছালামত উল্লাহসহ পাঁচ জঙ্গীর বিরুদ্ধে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত অঞ্চলের লোকজনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর হাত ধরে উত্থান ঘটে জঙ্গী ছালামত উল্লাহর। সম্প্রতি আটক ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলভী ছালামত উল্লাহ আরএসওর বাংলাদেশের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সৌদি ও তুরস্ক থেকে রোহিঙ্গাদের নামে অঢেল টাকা এনে নিজে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে ছালামতের রয়েছে অন্তত কয়েকশ’ কোটি টাকার জমি-জমা ও দালান কোটা। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর সহযোগিতায় এ জঙ্গী ছালামতের সৌদি আরবে ধনাঢ্যশালীদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। কক্সবাজারে জামায়াতের পরিচালনাধীন রাবেতা আলম আল ইসলামী হাসপাতালে বসে মীর কাসেম আলীর সঙ্গে জঙ্গী ছালামত উল্লাহ দেশে নাশকতা সৃষ্টি ও জঙ্গীপনার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৮০ সালে রাবেতা হাসপাতালে জামায়াতের মদদে ঐ আরএসও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করা হয়। ড. মোঃ ইউনুছ রোহিঙ্গা প্যাট্টিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) নামে প্রথমে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের পরামর্শে এ সংগঠনটি আরএসও নাম ধারণ করে। ২০১২ সালের জুলাই মাসে উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যে আরএসওর সঙ্গে আল কায়দাসহ আরও কয়েকটি জঙ্গী গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। নিজেদের কৌশলপত্র নির্ধারণ, মানচিত্র, পতাকা তৈরিসহ নিজস্ব সংবিধানও রয়েছে আরএসওর। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আরএসওর সমন্বয় করে থাকে সম্প্রতি চট্টগ্রামে আটক ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলভী ছালামত উল্লাহ। লন্ডন প্রবাসী জঙ্গী নেতা নুরুল ইসলাম সংগঠনের অর্থ সংগ্রহের মূল কাজটি করে থাকে বলে তথ্য মিলেছে।
সূত্র জানায়, কয়েক যুগ ধরে মিয়ানমারের একাধিক আরাকান বিদ্রোহী সংগঠন এদেশের মৌলবাদী একাধিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সহযোগিতায় অপতৎপরতা শুরু করে। সে সুযোগে আরাকান প্রদেশে একটি মহল মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা গভীর অরণ্যে ঘাঁটি স্থাপন করে সেখানে প্রশিক্ষণের মতো নানা ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে ও ১৯৭৮ সালে এদেশে পালিয়ে এসে বসতি গড়ে তোলা প্রভাবশালী রোহিঙ্গা ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশায় নিয়োজিত বিত্তশালী মানুষ (মিয়ানমার নাগরিক) সেসব রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা পরিচালিত আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) সংগঠনটিকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরএসওর সুরা সদস্যরা হচ্ছেÑ ড. মোঃ ইউনুছ, নুরুল ইসলাম, নাইক্ষ্যংছড়ি বিছামারার এজাহার হোসেন, মৌলভী আয়াছ, হাফেজ জাবের ও মৌলভী ছালামত উল্লাহ। বর্তমানে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে (মিয়ানমার অভ্যন্তরে) পাহাড়ে অবস্থিত ও লামায় গহিন অরণ্যে ঘাঁটিতে আরএসও সদস্যদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র সংরক্ষণ রয়েছে বলে সীমান্তের উপজাতীয় পরিবারের একাধিক লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আরএসও সর্বশেষ সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত হয় নতুন কমিটি। একই বছর ৩০ জুলাই নতুন কমিটি গঠিত হয়। কক্সবাজারে মুহুরীপাড়ায় ‘ইসলামী সংস্থার’ নামে সম্মেলনও করা হয়েছিল। ঐ সম্মেলনে আরএসও শীর্ষ লিডার লন্ডন প্রবাসী নুরুল ইসলাম ও মোঃ ইউনুছ উপস্থিত ছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন যথাক্রমে ড. মোঃ ইউনুছ, হাজী মোঃ জাবেদ ও রাশেদ আহমদ। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছে- ইউনুছ আবাদি, আবু আব্দুল্লাহ ছিদ্দিক, মৌলভী আবুল ফয়েজ, নূর মোহাম্মদ মনসুর, মৌলভী মোঃ আয়াছ, আবদুর রশিদ, মোঃ মাজেদ, আবু কাদের, আবু ইয়াহিয়া, মীর আহাম্মদ, আবদুল হামিদ, রুহুল আমিন, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ, আবু সালেহ, আলহাজ হাবিবুল্লাহ, ছৈয়দ আলম, হাফেজ আহমদ চেরাগ, ডাঃ আলম, মৌলভী সেলিম, মোস্তফা কামাল লালু, মৌলভী নুরুল ইসলাম, নূর হোসেন ও মৌলভী নজিরসহ অন্তত ৫০ জনের অধিক সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল। ঐ নির্বাচনে কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন নাইক্ষ্যংছড়ি বিছামারা কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা পুরনো রোহিঙ্গা নেতা এজাহার হোসেন।
ওসব ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ বা প্রত্যক্ষদর্শী আরএসওর মূল অবস্থান স্থলে অবাধ যাতায়াত করতে পারে না বলে জানা গেছে। আরএসওর বাংলাদেশ সীমান্তের (মিয়ানমার পাহাড়ে) ঐ ঘাঁটিতে প্রায় ২ থেকে ২৫০ সামরিক সদস্য রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। এসব সদস্য পাহাড়ে পৃথকভাবে নাইক্ষ্যংছড়ি দোছড়ি ইউনিয়নের ক্ষুরিক্ষ্যং থেকে শুরু করে টেংরাটিলা (কালো পাহাড়) ইংলং পাড়া পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মিয়ানমারে অরণ্যে অবস্থান করে থাকে। তাদের খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি নিয়মিত সরবরাহ করে থাকে বলে হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। আরএসওর এসব সদস্যের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের কতিপয় নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। সূত্র মতে, দুর্গম এলাকা এবং মিয়ানমার অভ্যন্তরে আরএসওর ঘাঁটি হওয়ায় বিজিবির পক্ষে সেসব এলাকায় নিয়মিত টহল ও নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে আটক ভয়ঙ্কর জঙ্গী ছালামত উল্লাহর অন্যতম সহযোগী রোহিঙ্গা জঙ্গী আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (এআরএনও) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রোহিঙ্গা ভিত্তিক চট্টগ্রাম কালাদন প্রেসের পরিচালক আবু তাহের ওরফে পিন্টু ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড কুতুপালং ক্যাম্পে বসবাসকারী মাস্টার ইকবালকে কক্সবাজার গাড়ির মাঠ এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের নিকট থেকে পুলিশ নগদ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রাদি উদ্ধার করেছে।
পাঠকের মতামত